– মু আল আমীন বাকলাই
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি /এ জীবন মন সকলি দাও/ তার মত সুখ কোথাও কি আছে?/ আপনার কথা ভুলিয়া যাও” – বাংলা সাহিত্যে এরূপ অনেক কালোত্তীর্ণ চরণের প্রণেতা কবি কামিনী রায়। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১২অক্টোবর ঝালকাঠি জেলার বাসন্ডা গ্রামে কবি কামিনী সেনের জন্ম। আজ কবি’র ১৬১তম জন্মদিন। মাত্র চার বছর বয়সে তার পিতা বিখ্যাত পন্ডিত সাহিত্যিক জমিদার চন্ডীচরণ সেনের হাতে তাঁর লেখাপড়ার হাতে খড়ি। তৎকালীন বাসন্ডা গ্রামখানির দৃশ্য ছিল অতিশয় মনোরম। গ্রামের পূর্ব দিক দিয়ে বাসন্ডা খাল প্রবাহিত। বাসন্ডা’য় মাইনর স্কুল, পোস্ট অফিস, খেয়াঘাট, গ্রাম্যরাস্তা, জমিদার বাড়ি, ছাপাখানা সবই ছিল। এই গ্রামে জন্ম কবির মাতা বামা সুন্দরী’র। যার সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে তিনি যখন রান্না করতেন সেই রান্নাঘরে একখানি শলাকা দ্বারা হস্তাক্ষর লিপিবদ্ধ করে তিনি লেখাপড়া শিখেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে কবি তার প্রথম কবিতা রচনা করেন। পিতামহ নীল চাঁদ সেন ছিলেন কবির লেখা কবিতার প্রথম শ্রোতা ও উৎসাহ দাতা। পিতা, পিতামহ আর মাতার উৎসাহ অনুপ্রেরণা কামিনী সেন কে কবি হওয়ার জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সোপান বপন করে দেয়। “বাল্যকালের ক্রিড়াকলয়িত সুমধুর শিশু বাল্যের উশৃংখল শত দুরন্তপনার মধ্যেও যখন তাহার ঠাকুর দাদার স্নেহমধুর কন্ঠের ছড়া শুনিত, তখনই নীরবে উৎকর্ণ হইয়া নির্নিমেষ নয়নে তাহার মুখের পানে চাহিয়ে থাকিত – যেন এমনি করিয়া বালিকা ভবিষ্যৎ জীবনের এক অজানা মধুর রাগিনী তাহার প্রাণের মধ্যে ঝংকৃত হইয়া উঠেতেছে শুনিতো “। বাল্যকাল থেকেই খুবই ভাবুক-প্রবন ও কল্পনা প্রিয় ছিলেন কবি। তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে দেশাত্মবোধ, নীতিকথা, প্রকৃতির কথা, প্রেম – রোমান্টিকতা, ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরিণতির কথা, পুত্র অশোকের মৃত্যুর পর অশোক সংগীতের মধ্যে বেদনার করুন সুর। তবে সব কিছু ছাপিয়ে কবি তার নিজ গ্রামের কথা ভুলেন নি। কবি’র নিজ গ্রাম বাসন্ডা এবং বাসন্ডা নদীর সৌন্দর্য নিয়ে লেখা একখানি কবিতা আজকে আমরা কবির এই ১৬১ তম জন্মদিনে তুলে ধরব। যেখানে কবি তার গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন, হিজল তমালে ঘেরা নদী আর গ্রামের শরীরখানি। নদীর তীরের সেই সৌন্দর্যময় গ্রামখানি কবি হৃদয়ে আঁকা ছিল পরিনত বয়সেও।
নিশানা
-কবি কামিনী রায়
“ধীরে ধীরে বাও মাঝি ধীরে ধীরে বাও,
বলে দেবো কোন ঘাটে লাগাবে এ নাও।
দিকে দিকে গেছে খাল, দেখি নাই কতকাল
নিশানা যা ছিল জলে ভেসে গেছে তাও।
ধীরে ধীরে বাও মাঝি ধীরে ধীরে বাও।
গাছে ভরা দুই কুল, দিনেতে না হত ভুল,
দেখা যেত ফাঁকে ফাঁকে আমাদের গাঁও;
চতুর্থী চাঁদের আলো, ঠাহর হয় না ভালো,
শুধাব এমন জন দেখিনা কোথাও।
ছিললোক যত চেনা, কেহ পথ চলিছে না
ধীরে বাও, দুই পারে চেয়ে চেয়ে যাও।
দেখতো কেয়ার ঝাড়, আর পূর্বদিকে তার
বড় শিমুলের দেখা পাও কিনা পাও।
সর্বাঙ্গ সাজায়ে ফুলে হিজল দাড়ায়ে কূলে
বুকে মুখ দেখে জলে? ভালো করে চাও
বাঁকা হিজলের মূলে বাঁধিবে নাও
এ আধারে ধীরে মাঝে কিছু ধীরে বাও।
কিশোরী বয়সে কবি বাসন্ডা গ্রাম ত্যাগ করে কলকাতায় যান। কলকাতার জীবনেই তার লেখাপড়া ও কবিতা রচনা। কলকাতায় কবি’র কর্মস্থল আর নারী নেতৃত্তের বিকাশ। সবকিছুর মধ্যেও কবি তার জন্মস্থানের কথা ভুলেননি যার পরিচিয় পাই এই নিশানা কবিতায়।
আজ ১৬১ তম জন্মদিনে কবিতাচক্র ঝালকাঠি ‘র পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধা।




