ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার
– বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং সাবেক বিশ্ব ব্যাংক সিনিয়র কর্মকর্তা
২২ জানুয়ারি সিলেটের গ্র্যান্ড সিলেট হোটেলে নীরবে কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে একটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছে। দেশের ১৯টি সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাছাই করা ১৪০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে ছিলেন মেডিকেল কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও, সরাসরি মুখোমুখি হন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান এর সঙ্গে। এই শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বাচিত হননি; নির্বাচিত হয়েছেন শুধুমাত্র মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। আর আলোচনার বিষয় ছিল বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের প্ল্যান, বাস্তবসম্মত নীতি ও বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা প্রথমবারের মতো একটি কাঠামোবদ্ধ যুব নীতি সংলাপে অংশ নিলেন, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওনার ঘোষিত “দ্য প্ল্যান”- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষি সংস্কার, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীর আত্মনির্ভরতা, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা এবং ধর্মীয় নেতাদের কল্যাণ- এই আটটি নীতিভিত্তিক স্তম্ভ। এগুলোকে আলাদা আলাদা প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবৃদ্ধিমুখী বাংলাদেশের জন্য পরস্পর-সংযুক্ত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
এই সংলাপে শিক্ষার্থীরা কঠিন ও বাস্তব প্রশ্ন তুলেছেন। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যাতে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যয়বহুল হাসপাতালে ছুটতে বাধ্য না হয়। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণা, এবং শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগহীনতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। কৃষি শিক্ষার্থীরা কৃষক কার্ডকে শুধু ভর্তুকি নয়, বরং কৃষকের মর্যাদা, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। নারী শিক্ষার্থীরা ফ্যামিলি কার্ডকে সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নের সেতুবন্ধন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন – যেখানে পুষ্টি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ একত্রিত হয়।

এই সংলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, এখানে সব বিষয়ে ঐকমত্য নয়, বরং যুক্তিনির্ভর আলোচনা ছিল মুখ্য। রাজনীতি এখানে আবেগী বক্তৃতা নয়, বরং সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। যে প্রজন্মকে প্রায়ই রাজনীতি বিমুখ বা হতাশ বলে চিহ্নিত করা হয়, সিলেটের এই সংলাপ তাদের জন্য একটি ভিন্ন বার্তা দিয়েছে: মেধার মূল্য আছে, প্রমাণের গুরুত্ব আছে, এবং নীতি প্রণয়নের আগেই তরুণদের কথা শোনা জরুরি।
১২ই ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ছিল উচ্চকণ্ঠের রেটরিক ও সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে তরুণ ও শিক্ষিত নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। সিলেটের এই মেধাভিত্তিক যুব সংলাপ দেখিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে শুনতে পারে, প্রশ্নকে ভয় না পেয়ে তা থেকে শক্তি নিতে পারে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে রাজনীতি ও সমাজের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠিত হতে পারে, এবং ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি ধীরে ধীরে নীতিনির্ভর রাজনীতিতে রূপ নিতে পারে।
এর তাৎপর্য শুধু সিলেটেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৃহৎ যুব জনসংখ্যা, উচ্চশিক্ষার বিস্তার, কিন্তু একই সঙ্গে বেকারত্ব, বৈষম্য ও জলবায়ু ঝুঁকির চাপ। এই বাস্তবতায় তরুণদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংস্কার কর্মসূচি টেকসই হতে পারে না। সিলেটের সংলাপ সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, এটি এককালীন উদ্যোগ নয়। সিলেটের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামী ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে র্যাডিসন হোটেলে একই ধরনের একটি যুব নীতি সংলাপ আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদি এই মডেলটি ধারাবাহিকভাবে, অঞ্চলভিত্তিকভাবে এবং প্রকৃত অর্থে মেধাভিত্তিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
রাজনীতি রেটরিকের বাইরে যেতে পারে। নেতৃত্ব প্রশ্নকে ভয় না পেয়ে তা গ্রহণ করতে পারে। আর তরুণরা দর্শক হয়ে নয়, অংশীদার হয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণে যুক্ত হতে পারে। তারেক রহমান সিলেটের যুব নীতি সংলাপে দেখিয়েছেন – এই পরিবর্তন সম্ভব। এখন দেখার বিষয়, এই ব্যতিক্রম নিয়মে পরিণত হয় কিনা।
#




